আন্তর্জাতিক

পুতিনের শেষের শুরু?

ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সামরিক অভিযানের বিপর্যয় ছিল চরম নাটকীয়। যেসব মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এতদিন পূর্বাভাস দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন তারাও এখন এগিয়ে আসছেন। তিন মার্কিন কর্মকর্তা নিউজউইককে বলেছেন, ইউক্রেনের সফল পাল্টা আক্রমণের পর রাশিয়ায় গুরুতর সংকটে পড়েছেন পুতিন। যুদ্ধের ব্যয় বৃদ্ধি, সেনাদের প্রাণহানি এবং নিষেধাজ্ঞার ফলে অর্থনৈতিক দুর্ভোগের কারণে ক্ষুব্ধ বেশ কয়েকজন রুশ রাজনীতিক ও সোশাল মিডিয়া সেলিব্রেটি প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। এক উচ্চ পদস্থ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এমনকি ক্রেমলিনপন্থী কণ্ঠস্বর, এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম– এই প্রথমবার ইউক্রেনে যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তারা পুতিনকে কোনঠাসা করতে ফেলছেন। ইউক্রেনের বিজয় প্রেসিডেন্ট পুতিনের শেষের শুরু।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় আরেকটি সূত্র জানায়, রাশিয়ার ইউক্রেনে যে পরাজয় নিশ্চিত– তা গত সপ্তাহে সন্দেহবাদীরাও মেনে নিয়েছে। মস্কো দাবি করতেই পারে যে, তারা ডনবাসে আরও মনোযোগ দিতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সেই আক্রমণও শেষ। জনবল ও সরঞ্জামের নিরিখে অভিযান শেষ হয়ে গেছে।

পেন্টাগনের এক সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাও এমনটি মনে করছেন। এই সপ্তাহের শুরুতে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, আমাদের পর্যালোচনা হচ্ছে ইউক্রেনের খারকিভে দখলকৃত ভূখণ্ড ছেড়ে দিচ্ছে রাশিয়া এবং সেনা প্রত্যাহার করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলছেন, কামান ও বিমান হামলার মাধ্যমে ডনেস্ক ও পশ্চিম খেরসনে রাশিয়া আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেন, এখন কঠিন অংশ আসছে। সব নজর পুতিনের ওপর। তিনি কি ক্ষমতায় থাকার জন্য রাশিয়াকে ধ্বংস করবেন? নাকি রাশিয়া তাকে ধ্বংস করবে এবং ইউক্রেনে বিপর্যয়ের জন্য তাকে জবাবদিহি করবে।

 

‘নিপূণ কৌশলে’ ভুল পথে পরিচালনা

গত মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেনের পদাতিক বাহিনী দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে বড় আকারের পাল্টা আক্রমণ শুরু করে রাশিয়াকে চমকে দিয়েছে। শহরের উত্তরে ফাস্ট গার্ডস ট্যাংক আর্মিকে দ্রুত রুশ সীমান্তে হটিয়ে দেওয়া হয়। খারকিভের ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে ইজিউম শহর রাশিয়ার কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করে ইউক্রেনীয়রা। পিছু হটার সময় রুশ সেনারা তাদের অস্ত্র-গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম ফেলে গেছে।

ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ইজিউমে মোতায়েনকৃত সেনারা তথাকিথত ডনেস্ক পিপল’স রিপাবলিকের ইউনিট। অস্ত্র ও জ্বালানির ঘাটতির কারণে তারা ৬০ কিলোমিটার পিছু হটেছে।

নির্বাসনে থাকা লুহানস্কের সামরিক প্রশাসক সেরহি হাইদাই বলেন, রাশিয়ান ও তাদের সহযোগীরা পালাচ্ছে রাশিয়ার দিকে। তাদের পালানোর লাইন দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার।

গত সপ্তাহে হাইদাই একটি ছবি প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা গেছে ইউক্রেনের পতাকা উড়ছে উত্তর ডনবাসের ওসকিল নদীর পূর্ব তীরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর পাওয়া যাচ্ছে, ইউক্রেনীয় সেনারা লিসিচানস্ক শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে। লিসিচানস্ক ডনেট নদীর তীরবর্তী শহর সেভেরোডনেস্কর বিপরীতে লুহানস্কে অবস্থিত। জুলাইতে রাশিয়া শহরটি দখল করে। লুহানস্ক অঞ্চলের দিকে ইউক্রেনীয় সেনাদের অগ্রগতির ফলে ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলকৃত ভূখণ্ড তারা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ইউক্রেনের আক্রমণের পরিকল্পনা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে। পশ্চিমের দিকে ৪৫০ কিলোমিটার দূরে খেরসন রণক্ষেত্রে রুশ সেনারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পেতে শুরু করেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনেীয় কামান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামরায় ডনিপার নদীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধ্বংস হওয়ার কারণে এমন অবস্থায় তারা পড়েছে।

পেন্টাগনের এক সিনিয়র সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, নিপূণ কৌশলে রাশিয়াকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে ইউক্রেন। রুশরা ভেবেছিল পাল্টা হামলা খেরসন অঞ্চলে চালাবে ইউক্রেনীয় সেনারা। কয়েক সপ্তাহ ইউক্রেন খেরসনে পাল্টা হামলার কথা বলে আসছিল। এর ফলে খারকিভে রাশিয়া নিজেদের প্রতিরক্ষা শিথিল করে ফেলে এবং ইউক্রেনীয় আক্রমণের মুখে লড়াই না করে হার মানে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, এর ফলে রুশদের মনোযোগ খারকিভ থেকে সরে যায়। অথচ এখানে হামলাই ছিল ইউক্রেনের মূল পরিকল্পনা। এপ্রিলে ইউক্রেনীয়দের খারকিভ থেকে পিছু হটার মতোই এটি গুরুত্বপূর্ণ। এখন রাশিয়ার সমরাস্ত্রও তাদের রক্ষা করতে পারবে না।

বুধবার রাতে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেন গত দুই সপ্তাহে ৮ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বেশি ভূখণ্ড রাশিয়ার কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার দখলে থাকা সব ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড মুক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। রুশ ভাষায় তিনি রাশিয়ার সেনাদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন।

জেলেনস্কি বলেন, ইতিহাস জনগণ লিখেন, কখনও অত্যাচারী লেখে না। আপনাদের (রুশ সেনা) সম্পর্কে ইতিহাসের বইয়ে কী লেখা হবে?

ইউক্রেনের বিদ্যুৎগতির পাল্টা আক্রমণের মুখে রুশ সেনারা এককভাবে ও পুরো ইউনিটসহ আত্মসমর্পণ করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, কয়েকটি ইউনিট আতঙ্কে পালিয়েছে।

ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, রণক্ষেত্রে পিছনে থাকা ইউনিটগুলো থেকে সেনাদের পলায়ন ঠেকাতে রাশিয়া রাজনৈতিক কমিশার নিয়োগ দিচ্ছে।

খারকিভে ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ ও রাশিয়ার পিছু হটার কারণে রাশিয়ার সেনার অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়েছে। ব্রিটিশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বরছে, ইজিউম ও পাশের কুপিয়ানস্ক হাতছাড়া হওয়ার ফলে ডনবাসের রণক্ষেত্রে রাশিয়ার রসদ সরবরাহ বিঘ্নিত হবে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, পুনরুদ্ধারকৃত ভূখণ্ড যদি ইউক্রেন ধরে রাখতে পারে তাহলে ডনবাসে রাশিয়ার জয়ী হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ফলে পুতিনের তথাকথিত সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। পুরো ডনেস্ক ও লুহানস্ক দখলের পরিকল্পনা অর্জিত হয়নি।

 

দায় চাপানোর চেষ্টা

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি খুব দ্রুত দখলকৃত সব ভূখণ্ড মুক্ত করে ফেলবেন এমন কিছু বলেননি। তবে তিনি অঙ্গীকার করেছেন রাশিয়ার পদক্ষেপ বা আলোচনা হলেও ইউক্রেন শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলছেন, পুতিনকে সমঝোতায় রাজি করাতে কী করতে হবে সম্পর্কে আমরা অন্ধকারে আছি। আমরা যা জানি তা হলো এখন আর তা শুধু সামরিক জয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পুতিনকে এখন তার নিজের টিকে থাকার জন্য সচেষ্ট হবে।

গত সপ্তাহে মস্কোর এক দল পৌর কর্মকর্তা জরিমানায় পড়ার ঝুঁকি নিয়েছেন। তারা প্রকাশ্যে দাবি করেছেন পুতিনকে বরখাস্ত করার জন্য। এক স্থানীয় কাউন্সিল রাশিয়ার পার্লামেন্ট ডুমার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউক্রেনে আক্রমণের পরিকল্পনা ও অর্থনীতির ক্ষতির জন্য পুতিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনতে। স্বতন্ত্র সংবাদমাধ্যম ও সোশাল মিডিয়া সেলিব্রেটিরা ইউক্রেনে রাশিয়ার পরাজয়ের খবর প্রচার করছে। মস্কোভস্কি কমসমোলেটস ট্যাবলয়েড লিখেছে, রাশিয়া শত্রুদের খাটো করে দেখেছে। আমরা হেরেছি এবং সেনাদের প্রত্যাহার করে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করেছি। তাই আমাদের সেনারা আত্মসমর্পণ করেনি।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলছে, ইজিউম থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার ‘পূর্ব পরিকল্পিত পুনঃসংগঠিত’ করার উদ্যোগ। যে পরিকল্পনায় ডনবাসে লড়াইয়ে আরও মনোযোগ কেন্দ্রীভুত করা হচ্ছে। রাশিয়ার এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সিনিয়র মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, মস্কো সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো বলে কোনও ইঙ্গিত দেখা যায়নি। এমনকি তারা যে ডনবাসে কৌশল পাল্টাচ্ছে তেমন কিছুও নজরে আসেনি। আমরা দেখছি ভয়াবহ যানজট, পরিত্যক্ত অস্ত্র ও ফাঁড়ি।

ইউক্রেনের সেনাবাহিনী রাশিয়ার ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের ছবি প্রকাশ করেছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, অতি মূল্যবান সামরিক সরঞ্জাম ফেলে যাওয়া ইঙ্গিত দেয় রাশিয়ার সেনা প্রত্যাহার পরিকল্পিত ছিল না। স্থানীয়ভাবে রুশ সেনা ইউনিট ভেঙে পড়েছে এবং তাদের মধ্যে কোনও শৃঙ্খলা ছিল না।

এমনকি মস্কোতে অনেকেই ইউক্রেনে রুশ সামরিক বাহিনীর পিছু হটার কথা স্বীকার করে নিচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের উপস্থাপক দিমিত্রি কিসেলেভ বলেন, বিশেষ সামরিক অভিযানের সম্মুখসারিতে এটি ছিল এখন পর্যন্ত কঠিনতম সপ্তাহ।

প্রথম মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ভবিষ্যতের জন্য পুতিনের বিকল্পগুলো সহজ নয়, বিশেষ করে দেশে যখন বিরোধিতার মুখে পড়ছেন।

দ্বিতীয় কর্মকর্তা বলেন, আমরা দিন দিন রাশিয়াকে পশ্চিমা অস্ত্রের ওপর দোষারোপ করতে দেখছি। মনে হচ্ছে রাশিয়ার হারের জন্য এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মজার বিষয় হলো, পুতিন ও রুশ কর্মকর্তারা দাবি করেন তাদের ন্যাটোকে হারানোর ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এখন তারা বলছে, আমরা জিততে পারিনি কারণ পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপের কারণে। এটি মস্কোর কাঁধ থেকে দায় সরানোর চেষ্টা।

সূত্র: নিউজউইক

Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Stream TV Pro News - Stream TV Pro World - Stream TV Pro Sports - Stream TV Pro Entertainment - Stream TV Pro Games - Stream TV Pro Real Free Instagram Followers PayPal Gift Card Generator Free Paypal Gift Cards Generator Free Discord Nitro Codes Free Fire Diamond Free Fire Diamonds Generator Clash of Clans Generator Roblox free Robux Free Robux PUBG Mobile Generator Free Robux 8 Ball Pool Brawl Stars Generator Apple Gift Card Best Android Apps, Games, Accessories, and Tips Free V Bucks Generator 2022