আন্তর্জাতিক

১৯৩৪: মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শক্তি প্রদর্শন

১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপ জয়ী দল আর্জেন্টিনার ফরওয়ার্ড ওমর লারোসার কাছে একটি জটিল প্রশ্নের জবাব ছিল একেবারে সহজ। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল দেশটির ক্ষমতাসীন নির্মম জান্তা যেভাবে তাদের টুর্নামেন্ট জয়কে কাজে লাগিয়েছে তাতে কি পদকটি কালিমালিপ্ত হয়েছে? যে অল্প কয়েকজন খেলোয়াড় বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন তিনি তাদের একজন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে লারোসা বলেছিলেন, কেউ কিছু জানে না। আমরা মানুষের জন্য, আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য খেলি। বিশ্বকাপ যদি ফিফা কর্তৃক অনুমোদিত হয়, সব ফেডারেশন যদি খেলে, আমাকে আমার কাজ করতে হবে। আমার কাজ হলো ফুটবল খেলা। যেমন চিকিৎসক বা সাংবাদিক। আপনারা আপনাদের কাজ করেন। ফিফা বিশ্বকাপের নির্দেশ দিয়েছে, তাই আমরা খেলেছি।

তিনি বলেন, ‘ফুটবলের প্রতি আমার জীবন নিবেদিত। এটি ছিল সেরা। কারণ, মাঠের মধ্যখানে ছিলাম, সব জনগণের সমর্থন আমি শুনেছি, অনেক নীল-সাদা পতাকা ছিল। ফুটবল আমাকে যা দিয়েছে এটি সেরা, চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং ট্রফি ঊর্ধ্বে তুলে ধরা।’

লারোসা যে মন্তব্য করেছেন তা ১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপ খেলা পুরো দলের মতো নয়। অনেকেই এখনও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চান না।

লারোসা বলেন, আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেকের নিজস্ব মত রয়েছে।

লারোসাকে যে নির্মমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল সেটির কেন্দ্রে ছিল নৌবাহিনীর একটি কারিগরি স্কুল। হোর্হে ভিলেদার শাসনামলে এটিকে একটি নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সেখানে রাখা ৫ হাজার বন্দির মধ্যে মাত্র ১৫০ জন জীবিত ছিলেন। অনেককে ধর্ষণ, নপুংসক করা হয়েছে, কুকুরের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, কাউকে ইলেক্ট্রিক ব্যাটন লাগানো হয়েছে। বিশ্বকাপ চলাকালেও এমন নিপীড়ন অব্যাহত ছিল। মাত্র ৫০০ মিটার দূরে বিশ্বকাপের মাঠের গর্জন শুনতে পেতেন বন্দিরা। তাদের পরিচয় ছিল ‘লাপাত্তা’ হিসেবে। এর অর্থ হলো ফুটবল পুরোপুরি স্বাগতিক দেশের নির্মম বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেনি।

প্রতি বৃহস্পতিবার নিখোঁজ ব্যক্তিদের মায়েরা প্লাজা ডে মায়োতে মিলিত হতেন। তারা মনে করিয়ে দিতেন দেশের নিখোঁজ সন্তান। কয়েকজন খেলোয়াড়ও শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হতেন সেখানে। তাদের একজন সুইডেনের রাল্ফ এডস্ট্রম।

তিনি বলেন, আমরা শুধু আমাদের সমর্থন জানাতে গিয়েছি। দলের সাত বা আটজন, কয়েকজন বেলজিয়ান ও ডাচ খেলোয়াড়ও আমাদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল। আমার সেই শব্দ, সেই আহ্বান মনে আছে। আমরা শুধু আমাদের সন্তানরা কোথায় আছে জানতে চাই? জীবিত নাকি মৃত? তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছিল। আমরা যেন বিশ্বকাপ খেলতে না যাই, এজন্য অনেক প্রতিবাদ হয়েছে। কারণ, এক সুইডিস-আর্জেন্টাইন নারী ড্যাগমার হামেলিন নিখোঁজ হয়েছিলেন।

এখনকার তুলনায় অতীতে বয়কট কর্মসূচি ছিল অনেক বেশি। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারানো পশ্চিম জার্মানির হয়ে ফাইনালে গোলদাতা পল ব্রেইটনার খেলতে অস্বীকৃতি জানান। জার্মানির সেপ মায়ের ও ইতালির পাওলো রসি স্বাক্ষর করেছিলেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আবেদনে। অবশ্য বেশিরভাগ ফুটবলার অজ্ঞতাকেই স্বীকার করে নেন। সবাই বিশ্বকাপে খেলতে নিজের সুযোগ চেয়েছিলেন।

২০২২ সালের সমান্তরাল পরিস্থিতি স্পষ্ট ও শিক্ষণীয়।

ক্রীড়া জগতের যেকোনও কিছুর তুলনায় প্রতিটি বিশ্বকাপে গভীর রাজনৈতিক দিক থাকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপে রাজনৈতিক দিক ছিল ভিন্ন মাত্রায়। ১৯৩৪ সালে ইতালি, ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা এবং ২০১৮ সালে রাশিয়া। এই তিনটি বিশ্বকাপের কোনোটিই মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশে অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে এই তিনটি টুর্নামেন্ট ঘিরে নিপীড়ন, প্রচারণা ও নৈতিকতার বিষয়ে ছাড় দিতে হয়েছিল।

রাজনৈতিকভাবে আচ্ছন্ন চতুর্থ বিশ্বকাপ কাতারের আয়োজনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হলো–এসব নিপীড়ন, প্রচারণা ও নৈতিকতা লঙ্ঘন কতটা দৃশ্যমান ছিল; প্রতিযোগিতাকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে; ফুটবলাররা কেমন বোধ করেছেন; কীভাবে তারা মানিয়ে নিয়েছেন এবং অর্জন কতটা কালিমালিপ্ত হয়েছে।

এটা বলা অতিরঞ্জিত হবে না যে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন হয়েছিল ভিন্ন পৃথিবীতে। তখন ছিল না কোনও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ছিল না মানবাধিকারের সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা। ১৯৩৬ সালের নাৎসি জার্মানি আয়োজিত অলিম্পিকও ছিল না। তাই বেনিতো মুসোলিনির বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য এক নতুন পৃথিবী উন্মোচন করেছিল। এটিকে প্রথম ক্রীড়া-ধোলাই প্রতিযোগিতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এই কারণে এটির রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গভীরতা ছিল অনেক বেশি, বাস্তবতা ভয়াবহ গুরুতর না হলে সহজেই এটিকে পুতুল নাচ বলা যেত।

আগে থেকেই মুসোলিনি ফুটবল ও বিশ্বকাপে আবেগ ও প্রচার ক্ষমতার বিষয়টি অনুধাবন করেছেন। তিনি এটিও অনুধাবন করেছেন, এটি কীভাবে চিরায়তভাবে ইতালির ফ্যাসিবাদী আদর্শের ধ্বজাধারীর জন্য পৌরুষপূর্ণ। বিশ্বকাপ আয়োজনের লড়াইয়ে সুইডেনকে পরাজিত করতে প্রচুর লবিং করতে হয় ইতালিকে। এটি ছিল পুরনো রুটি ও সার্কাস। যেমনটি মুসোলিনি দাবি করতেন ‘নতুন রোমান সাম্রাজ্য’। জাতীয়তাবাদী সমাবেশের একটি দিক ছিল বিশ্বকাপ। লিবিয়া ও আবিসিনিয়ায় আক্রমণের সমতুল্য। এর গুরুত্ব তুলে ধরে মুসোলিনির প্রধান প্রচারণাবিদ অ্যাচিলি স্টারাসে প্রতিযোগিতা সমন্বয় করেন। স্টারাসে ফ্যাসিবাদীদের অভিবাদন তৈরি করেছিলেন এবং কাল্ট অব সেকেন্ড ডুসের সর্বোচ্চ যাজক ছিলেন। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যাতে করে ইতালি টুর্নামেন্টের জন্য শাসকদের প্রচারে নিমজ্জিত থাকে।

নতুন স্টাডিও ওলিম্পিকো গ্রান্ডে টরিনোর নাম পাল্টে রাখা হয় স্টাডিও বেনিতো মুসোলিনি। নতুন ক্রীড়া স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ। দশ লাখের মতো পোস্টার, ডাকটিকিট, ব্যাজ, চাবির রিং বিতরণ করা হয়েছিল।

শুধু ইতালির জনগণ নয়, বিশ্বের মানুষও তাদের লক্ষ্য ছিল। মুসোলিনি বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিলেন ফ্যাসিবাদই ভবিষ্যৎ। বিদেশি সমর্থকদের ভর্তুকি ও ভ্রমণে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কতটা চমৎকারভাবে প্রতিযোগিতার আয়োজন চলছে তা দেখাতে একসঙ্গে আটটি ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হয়। বিশ্বকাপ ট্রপির তুলনায় ছয়গুণ বড় একটি বিশেষ ট্রপিও বানিয়েছিলেন মুসোলিনি। এটি ছিল কোপা ডেল ডুস। এতে ছিল ফ্যাসিবাদের প্রতীকও।

সাংগঠনিক শক্তির এই প্রদর্শন বিশ্বের কাছে ইতালির জয় তুলে ধরে। শোনা যায় একপর্যায়ে ইতালির ম্যানেজার ভিট্টোরিও পজ্জোতে পুরো দলের সামনে নাকি বলেছিলেন, ‘তিনি ব্যর্থ হলে তাকে যেন ঈশ্বর সাহায্য করেন’।

শক্তি প্রদর্শনের এসব পদক্ষেপে ছিল সাধারণ ছোঁয়াও। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উদ্বোধনী খেলায় নিজের ছেলেদের নিয়ে হাজির হয়েছিলেন মুসোলিনি। এমনকি নিজের টিকিটের টাকাও তিনি দিয়েছিলেন।

স্বাগতিকদের প্রায় সব খেলায় মাঠে গিয়েছিলেন মুসোলিন। তবে সাধারণভাবে টুর্নামেন্ট নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল না। অনেক খেলায় স্টেডিয়ামে দর্শকদের আসন ছিল খালি। কিন্তু রেডিও সম্প্রচারে বলা হতো এগুলো কত বেশি দর্শকপূর্ণ ছিল।

ইতালির ফুটবল দলের ফ্যাসিবাদী অভিবাদন

কিংবদন্তী গুইসেপ মায়েজ্জার নেতৃত্বে ইতালি চমৎকার দলগুলোর একটি ছিল। কিন্তু তারা হয়তো সহযোগিতা পেয়েছিল। মুসোলিনি রেফারি নির্বাচন করতেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ফাইনালের জন্য ইভান একলিন্ডকে নির্বাচন। সেমিফাইনালে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ইতালিদের আগ্রাসন এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল এই সুইডিশ রেফারির বিরুদ্ধে। পরে জানা গিয়েছিল যে ফাইনালের আগের রাতে মুসোলিনি ও একলিন্ড একসঙ্গে নৈশভোজ করেছিলেন।

ফাইনালে যেতে জার্মানিকে হারায় চেকোস্লোভাকিয়া। ফাইনালের দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে চেকোস্লোভাবিকায় সোভিয়েত ইউনিয়নে যোগ দেয়। বিশ্বকাপের ফাইনাল পরিণত হয় সমাজতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের লড়াইয়ের। মুসোলিনির জন্য জয় ছিল আবশ্যক।

ফাইনালে ৫৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা স্টাডিও ন্যাজিওনাল ডেল পার্টিটো ন্যাজিওনাল ফ্যাসিস্টাতে ছিলেন ৬৫ হাজার দর্শক। মুসোলিনি সাদা স্যুট পরে হাজির হন। দর্শকরা যখন ‘ডুস, ডুস’ গান গাইছিল তখন তিনি তাদের প্রতি ফ্যাসিবাদী অভিবাদন জানান। অনেক ব্যানার ছিল, সেগুলোতে লেখা ছিল, ‘মুসোলিনি সবসময় সঠিক’।

জন স্পার্লিংয়ের লেখা ‘ডেথ ওর গ্লোরি: দ্য ডার্ক হিস্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ে ওই দিনের অনুভূতির একটা ধারণা পাওয়া যায় সাবেক তরুণ ফ্যাসিবাদী জিওভান্নি মেইফ্রেডির সাক্ষাৎকারে।

স্পার্লিংকে তিনি বলেন, খুব সুন্দর দিন ছিল। মাঠে কালো শার্ট পরে অনেক তরুণ হাঁটছিল। কার্যত আমরা কুচকাওয়াজের মতো আমাদের সংগীত গেয়ে মাঠে প্রবেশ করি। ভেতরে আওয়াজ ছিল ব্যাপক, মহাকাব্যের মতো। যেন কলোসিয়াম যুগে গ্ল্যাডিয়েটরের দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া।

রাইমুন্ডো ওরসি ও অতিরিক্ত সময়ে অ্যাঞ্জেলো স্কিয়াভোর গোলে ২-১ গোলে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারায় ইতালি। মুসোলিনি এই জয়কে ‘অতীতে রোমান সম্রাটদের অর্জনের মতো।

মেইফ্রেডির মতে, এই জয়ের বেশিরভাগ ছিল স্বৈরশাসকের হাতে। তার নাম পরে কুখ্যাত হয়ে যায়। কিন্তু আমি কখনও তাকে ভুলিনি, এখনও মনে হচ্ছে। ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের মতো আর কিছু হয় না।

ওই সময়কার ফিফা সভাপতি জুলে রিমেও বুঝতে পেরেছিলেন, মুসোলিনির সঙ্গে একইভাবে বিশ্বকাপ জড়িয়ে পড়েছে, হয়তো আরও দ্ব্যর্থবোধক অর্থে।

তিনি বলেছিলেন, আমার মনে হয়েছিল বিশ্বকাপ কার্যত ফিফা আয়োজন করেনি, মুসোলিনি করেছেন।

ফুটবলাররা এমনটি মনে করেছিলেন কিনা তা বিতর্কের বিষয়। পজ্জো ছিলেন স্বৈরাচারী কিন্তু ফ্যাসিবাদী না। মায়েজ্জাকে নিয়মিত প্রপাগান্ডার জন্য ব্যবহার করা হতো। রাইট-ব্যাক এরাল্ডো মঞ্জেগিলো মুসোলিনি ও তার সন্তানদের টেনিস শিখিয়েছেন।

মেইফ্রেডির মতো তারাও মনে করেন না তাদের অর্জন কোনও কারসাজিতে এসেছে। তাদের এটি সহজ শব্দ। শুধুই ফুটবল। আর এটিই ছিল চূড়ান্ত পদক।

(চলবে)

আগামী পর্বে থাকছে ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ

সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট

Source link

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Stream TV Pro News - Stream TV Pro World - Stream TV Pro Sports - Stream TV Pro Entertainment - Stream TV Pro Games - Stream TV Pro Real Free Instagram Followers PayPal Gift Card Generator Free Paypal Gift Cards Generator Free Discord Nitro Codes Free Fire Diamond Free Fire Diamonds Generator Clash of Clans Generator Roblox free Robux Free Robux PUBG Mobile Generator Free Robux 8 Ball Pool Brawl Stars Generator Apple Gift Card Best Android Apps, Games, Accessories, and Tips Free V Bucks Generator 2022